শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের ‘দিল্লি জয়’ ও চীন যাত্রার ঘোষণা কী বার্তা দিচ্ছে?

আহমদ মতিউর রহমান
শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকের সাম্প্রতিক ভারত সফর বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েক এই পদে আসীন হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে ১৬ ডিসেম্বর ভারত সফরে যান।  বিশ্লেষকরা এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করে কৌশলী সফর বলেও বর্ণনা করেছেন। বার্তা সংস্থা বলছে, এই সফরের উদ্দেশ্য ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা খাতে।
তবে তিনি কেন তার আদর্শগত মিত্র চীনকে বাদ দিয়ে প্রথম বিদেশ সফরে দিল্লিকে বেছে নিলেন তার তাৎপর্যটি ভেবে দেখা দরকার। কাছাকাছি সময়ে নেপালী প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি বর্তমান মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতকে বেছে না নিয়ে চীনকে বেছে নিয়েছেন। কথা হচ্ছে দু জনের সফরে এই বৈপরীত্য কেন। বিশ্লেষকরা এটাকে মার্কসবাদী নেতা দিশানায়েকের একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। যদিও শ্রীলংকার রাষ্ট্রনেতারা সাধারণত ভারত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতে তাদের প্রথম সফর করেন। তিনিও সেটাই করেছেন এবারের ভিন্ন পরিস্থিতিতে। যেটা দীর্ঘ সময় ভারতের পক্ষপুটে থাকা নেপাল করে দেখিয়েছে।
এটা নিয়ে সংবাদপত্র ও বার্তা সংস্থা শিরোনাম করেছে ‘শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতির ভারত সফর, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত’। আসলে কী তাই? সেই প্রশ্নও আসছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সাথে তার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারত সফরের প্রথম দিনেই দিশানায়েক ভারতের বিদেশ ও অর্থমন্ত্রীদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
দিশানায়েক জানান, তাদের আলোচনা মূলত ভারত-শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার এবং পর্যটন ও শক্তি খাতে উন্নতি নিয়ে ছিল। তিনি বলেন, এই আলোচনা আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক গভীর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার প্রমাণ।
এতে বলা হয়, ভারত শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী এবং ভারত মহাসাগরে চীনের বাড়ন্ত প্রভাবের কারণে নয়া দিল্লি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার দিকে মনোযোগী। শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রেসিডেন্ট দিশানায়েক চীনের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে কিছু কথা বলেন। তিনি জানান শীঘ্রই বেইজিং সফরে যাবেন এবং চীনা নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
খালিজ টাইমস বলছে, শ্রীলঙ্কা ২০২২ সালে সবচেয়ে ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছিল, যখন বিদেশি মুদ্রার অভাবে খাদ্য, তেল ও ওষুধ আমদানির জন্য অর্থ পরিশোধ করতে পারছিল না এবং দেশটি তার ৪৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়।  এই সফরটি ভারত এবং শ্রীলঙ্কার সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শ্রীলঙ্কার আর্থিক পুনর্গঠনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি প্রদান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মধ্যে বৈষম্য রোধের একটি নতুন পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সফরে কী হয়েছে? শ্রীলঙ্কাকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ করবে ভারত। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগ স্থাপন ও পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র তৈরিতে সহায়তা করবে ভারত।
রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোনেট এলএনজি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য এলএনজি সরবরাহ চুক্তি করেছে। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কোচিতে অবস্থিত পেট্রোনেটের টার্মিনালের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কাকে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। মোদি বলেন, ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যেও ভারত বিভিন্ন প্রকল্পে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। ভারতের ঋণের সহায়তা শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোদি আরও বলেন, ভারত ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কাকে ৫ বিলিয়ন বা ৫০০ কোটি ডলার ঋণের সহায়তা দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ভারত, ফ্রান্স, জাপান ও চীন শ্রীলঙ্কার ঋণ পুনর্গঠনে এগিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে ভারত অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর এই ঋণ পুনর্গঠন জরুরি ছিল। বর্তমানে দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তত্ত্বাবধানে একটি বেইলআউট কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে।
একটু পেছন ফিরে দেখা যাক। শ্রীলংকায় গত দু বছরে অনেক ওলট পালট ঘটে গেছে। দেশটাতে রাজাপাকসে পরিবারের à§§à§« বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটেছে। দেশটি দেউলিয়া হয়ে যায় আর এই পরিবারের শেষ শাসকদ্বয় প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে ও তার ভাই প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রবল গণআন্দোলনের ফলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এর পর দু বছরের চেষ্টার ফলে দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, মুদ্রার দরপতনের ধারা থেমেছে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বেড়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে রিজার্ভ। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। সাবেক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ওলট পালট করে দিয়ে এক সময়ের ক্ষুদ্র মার্কসবাদী দল জেভিপি ও এর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপল পাওয়ার (এনপিপি) জোট নেতা দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন এবং আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার জোট নিরংকুশ বিজয় লাভ করে তার ক্ষমতা শক্তিশালী করেছে। পাঁচ বছর আগেও এটা অচিন্তনীয় ছিল। বামপন্থী জোট ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের (এনপিপি) নেতা অনূঢ়া গত ২৩ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দল ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’ (জেভিপি) শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে ঘোষিত চীনপন্থী। ১৯৮০-এর দশকে নয়াদিল্লিকে ‘শ্রীলঙ্কার অন্যতম বড় শত্রু’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন জেভিপির প্রতিষ্ঠাতা রোহন উইজেভরা। সাম্প্রতিক সময়ে রাজাপাকসে পরিবার চীন ও ভারতের দিকে হেল দোল করেছেন। কিন্তু অনূঢ়া নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে গেলেন ভারতে।
ভারত শ্রীলঙ্কার ২৫টি শহরের বিভিন্ন প্রকল্পে সহায়তা দিচ্ছে। ২০২৫ সালে জাফনা ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের ২০০ ছাত্রকে বৃত্তি দেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে শ্রীলঙ্কার ১ হাজার ৫০০ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণ দেবে ভারত। দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি আগামী বছর চূড়ান্ত করা হবে। এত কিছু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এক দিকে অন্য দিকে চীন এ ব্যাপারে শ্যান দৃষ্টি রেখে চলেছে।
দিশানায়েক কেন ভারত গেলেন তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তার এক বিবৃতিতে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আলাপ-আলোচনা ইন্দো-শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা, বিনিয়োগের সুযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং পর্যটন ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে উন্নয়নের মনোনিবেশ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব সম্পৃক্ততা আমাদের দুই দেশের মধ্যে অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।’
ভারত জয়ের পর দিশানায়েকে এখন চীন জয় করতে চাচ্ছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এটা করা কি সম্ভব সে প্রশ্নও আসছে। বাস্তবতা হচ্ছে শ্রীলংকার এই কৌশল নেয়া ছাড়া উপায় নেই মনে করেন কোন কোন বিশ্লেষক।
নয়াদিল্লি শ্রীলঙ্কায় বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। অপর দিকে চীন শ্রীলঙ্কার বৃহত্তম ঋণদাতা। তবে ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কায় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। সেই ধারা অক্ষুন্ন রেখে অগ্রসর হতে চায় শ্রীলংকা।
জানুয়ারি মাসেই চীনের নেতাদের সাথে আলোচনার লক্ষ্যে দিশানায়েক বেইজিং ভ্রমণ করবেন বলে জানা যাচ্ছে। দীর্ঘ বিলম্বিত বিদেশি ঋণ কাঠামো পুনর্বিন্যাস শেষে ২২ ডিসেম্বর এ ঘোষণা দিয়েছেন দিশানায়েকে। দেশটির সংবাদমাধ্যম লঙ্কা নিউজ  জানায়, ২০২২ সালে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে শ্রীলংকা। তখন তাদের মোট যে পরিমাণ অপরিশোধিত ঋণ ছিল তার অর্ধেকেরও বেশি শুধু চীনের কাছে। ওই সময় খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করার বিল পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ফুরিয়ে যায় শ্রীলংকার।
ভয়াবহ সেই অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে শ্রীলংকা। তাদেরকে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ ঋণ দেয়ার পর আবার অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরে এসেছে। বামপন্থি প্রেসিডেন্ট দিশানায়েকে নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার দল ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবে। পার্লামেন্টে আগাম নির্বাচনে তার দল বিপুল জয় পায়। ২১ ডিসেম্বর তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী মাসের মাঝামাঝি (জানুয়ারি) চীন সফরে থাকবো। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেননি দিশানায়েকে।
চীনের ঋণে শ্রীলঙ্কা বেশ কটি বিতর্কিত অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প শুরু করে, যা তাদের ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দেয় দক্ষিণের হাম্বানটোটা জেলার বড় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর। এই প্রকল্প শুরুর পর থেকেই লোকসান দিয়ে আসছে দেশটি। আরো আছে কলম্বোয় বিরাট কনফারেন্স সেন্টার, যা চালু হওয়ার পর থেকেই অব্যবহৃত আছে। এ ছাড়া আছে ২০ কোটি ডলার খরচে তৈরি বিমানবন্দর। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে বিমানবন্দরটি বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার মতো আয়ও করতে পারছিল না। প্রকল্পগুলো গতি পেয়েছিল রাজাপক্ষে পরিবারের হাত ধরেই। পরিবারটি দুই দশক ধরে শ্রীলঙ্কায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিল। এসব কথা মাথায় রেখে দিশানায়েকেকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। তার চীন সফরের পর দেশটির এখনকার স্ট্রাটেজি বুঝা যাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ